বাংলা ভাষার উপর আগ্রাসন ও আমাদের প্রতিরোধ

বাংলা ভাষার উপর আগ্রাসন ও আমাদের প্রতিরোধ

ভূমিকা

ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহক। একটি জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, এবং স্বকীয়তা ভাষার মাধ্যমে সংরক্ষিত ও বিকশিত হয়। বাংলা ভাষা তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে একাধিকবার আগ্রাসনের শিকার হয়েছে—কখনও বিদেশি শাসকদের দ্বারা, কখনও অভ্যন্তরীণ নীতির ফলে। ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাগত রাজনীতিতে বাংলা ভাষা আজও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত বাংলা ভাষার উপর পরোক্ষভাবে আগ্রাসনের ইঙ্গিত বহন করছে। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

১. ভাষাগত আগ্রাসনের ইতিহাস

(ক) ব্রিটিশ শাসনে বাংলা ভাষার সংকট

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে, তখন থেকেই বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির উপর নানাবিধ আক্রমণ শুরু হয়। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ইংরেজি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে, যার ফলে বাংলা ভাষা শিক্ষাব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়তে থাকে। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলা ভাষা দ্বিতীয় স্তরে নেমে যায়।

(খ) পাকিস্তানি শাসনে বাংলা ভাষার জন্য রক্তক্ষয়ী লড়াই

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব বাংলা (আজকের বাংলাদেশ) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে, পাকিস্তানি সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক বীর শহিদ হন এবং অবশেষে ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

(গ) স্বাধীন ভারতে বাংলা ভাষার চ্যালেঞ্জ

ভারতের স্বাধীনতার পরও বাংলা ভাষার উপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৯৬১ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়, যেখানে ১১ জন ভাষাসৈনিক শহিদ হন।

বর্তমানে, কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতি এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে হিন্দির প্রসার বাংলা ভাষার অস্তিত্বকে নতুন সংকটে ফেলেছে।

২. বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলা ভাষার সংকট

(ক) জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে ভাষা আগ্রাসন

২০২০ সালে চালু হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) ভারতজুড়ে তিন-ভাষা নীতি প্রয়োগের প্রস্তাব দেয়, যেখানে বাংলা ভাষার গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই নীতির ফলে—

  • বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় হিন্দি ও সংস্কৃতের আধিপত্য বাড়বে।
  • বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
  • স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে বাংলার ভূমিকা হ্রাস পাবে।

(খ) সরকারি চাকরিতে বাংলা ভাষার প্রাধান্য কমছে

পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে বাংলার গুরুত্ব দিন দিন কমছে। রেলওয়ে, ব্যাঙ্কিং, পোস্ট অফিস, এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে।

(গ) বেসরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অবস্থান দুর্বল হচ্ছে

কলকাতা শহর এবং অন্যান্য নগর কেন্দ্রে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থাগুলি বাংলা ভাষার বদলে ইংরেজি এবং হিন্দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাঙ্ক, বিমানবন্দর, বড় বড় বিপণিবিতান, এমনকি অনলাইন সেবাগুলিতেও বাংলা ভাষার ব্যবহার কমে যাচ্ছে।

৩. বাংলাপক্ষের আন্দোলন ও ভাষা রক্ষার সংগ্রাম

(ক) বাংলাপক্ষের আত্মপ্রকাশ

বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় ২০১৭ সালে বাংলাপক্ষ নামক সংগঠন গঠিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো—

  • সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
  • শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষার গুরুত্ব বাড়ানো।
  • কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
  • প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ ব্যবহারের দাবি তোলা।

(খ) বাংলাপক্ষের আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলি

  • প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলা ভাষায় পড়াশোনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চাকরিতে বাংলা ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • রেলওয়ে, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস এবং কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হবে।
  • বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, এবং সরকারি নথিতে বাংলা ভাষা নিশ্চিত করতে হবে।

(গ) বাংলাপক্ষের কার্যক্রম ও প্রতিবাদ

বাংলাপক্ষ কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বর্ধমানসহ বিভিন্ন জেলায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার, প্রতিবাদ মিছিল, গণস্বাক্ষর অভিযান, এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তারা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় সংগ্রাম চালাচ্ছে।

৪. বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য আমাদের করণীয়

(ক) বাংলা ভাষার চর্চা ও প্রচার বাড়ানো

  • প্রতিটি বাঙালির দায়িত্ব বাংলা ভাষাকে দৈনন্দিন জীবনে আরও বেশি ব্যবহার করা।
  • বাড়িতে ও কর্মস্থলে বাংলা ভাষায় কথা বলা।
  • বাংলা ভাষার বই, পত্রিকা ও সংবাদপত্র পড়া।
  • অনলাইনে বাংলা ভাষার কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার করা।

(খ) শিক্ষায় বাংলা ভাষার গুরুত্ব বাড়ানো

সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করানো এবং উচ্চশিক্ষায় বাংলার গুরুত্ব বাড়ানো।

(গ) প্রশাসন ও সরকারি দপ্তরে বাংলা ভাষা চালু করা

সরকারি পরিষেবাগুলিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। নাগরিকরা যদি সরকারি কাজকর্মে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে প্রশাসন বাধ্য হবে বাংলা ভাষায় কাজ করতে।

(ঘ) বেসরকারি খাতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা

ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির বিজ্ঞাপন, নোটিশ এবং অফিসিয়াল কাজকর্মে বাংলা ভাষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। আমরা যদি ক্রেতা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রচলনের দাবি জানাই, তাহলে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে বাংলা ভাষা ব্যবহারে বাধ্য করা যাবে।

উপসংহার

বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শুধু আবেগ নয়, বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাপক্ষের মতো আন্দোলন বাংলা ভাষার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তবে শুধু সংগঠনের লড়াই যথেষ্ট নয়—এটি আমাদের সকলের লড়াই। বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা করা মানে আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, এবং পরিচয় রক্ষা করা। প্রত্যেক বাঙালিকে এই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলা ভাষাকে গর্বের সঙ্গে বহন করতে পারে।

ভাষা বেঁচে থাকে তার ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে। তাই আমাদের প্রতিদিন বাংলা ভাষা ব্যবহার করা, প্রচার করা, এবং এর অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন। বাংলা ভাষা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রতীক।

বাংলা ভাষার উপর আগ্রাসন ও আমাদের প্রতিরোধ

তথ্যসূত্র

Spread the love