
সীমাহীন ক্ষুধা, ভোগবাদ এবং সভ্যতার মুখোশ নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ
মানুষই আসল জম্বি, এই ব্যঙ্গাত্মক তুলনাটি আমাদের সীমাহীন ভোগের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। সিনেমার জম্বিকে দেখে আমরা ভয় পাই। তার চোখে হাহাকার, মুখে ক্ষুধা, সামনে যা পায় তাকেই গ্রাস করার উন্মত্ততা। অথচ পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে সমাজের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে, জম্বি কি সত্যিই কেবল কল্পনার চরিত্র?
জম্বির প্রধান বৈশিষ্ট্য সীমাহীন ক্ষুধা। মানুষেরও ক্ষুধা আছে, তবে তা শুধু খাবারের নয়। সম্পদ, জমি, খ্যাতি, ক্ষমতা, বাজার এবং প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব, সবকিছুই সে আরও বেশি করে চায়। প্রয়োজন মিটে গেলেও তার সংগ্রহ থামে না।
মানুষই আসল জম্বি: প্রয়োজনের পরেও যে ক্ষুধা
বন্য প্রাণী সাধারণত প্রয়োজনের সীমা বোঝে। বানর পেট ভরলে ফল ছেঁড়া বন্ধ করে। বাঘ শিকারের পরে ক্ষুধা মিটলে থামে। ঈগল প্রয়োজন ছাড়া আকাশ থেকে ঝাঁপায় না। কিন্তু মানুষ নিজের প্রয়োজনকে প্রতিদিন নতুন নামে বড় করে তোলে।
পেট ভরা থাকলেও নতুন খাবারের প্রলোভন, থাকার জায়গা থাকলেও আরও বড় বাড়ির আকাঙ্ক্ষা, ব্যবহারযোগ্য জিনিস থাকলেও নতুন পণ্যের প্রতি ছুটে যাওয়া। এই অভ্যাসকে আমরা উন্নতি বলি, অথচ এর বড় অংশই তৈরি হয় অসন্তোষ এবং তুলনার বাজার থেকে।
প্রকৃতি যখন ভোগের গুদাম
মানুষ বন কাটে, নদী শুষে নেয়, পাহাড় ভাঙে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাস ধ্বংস করে। পৃথিবীকে সে একটি যৌথ বাসস্থান হিসেবে না দেখে নিজের ব্যক্তিগত ভাণ্ডার বলে মনে করে। প্রকৃতির কাছ থেকে নেওয়ার হিসাব আছে, ফিরিয়ে দেওয়ার দায় যেন নেই।
সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত লোভে নয়। এমন এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভোগকে সাফল্যের চিহ্ন হিসেবে দেখানো হয়। বিজ্ঞাপন আমাদের অভাব তৈরি করে, বাজার সেই অভাবের সমাধান বিক্রি করে, তারপর আবার নতুন অভাবের জন্ম দেয়।
মানুষই আসল জম্বি, নাকি সভ্যতা আমাদের আলাদা করে?
জম্বির ডিগ্রি নেই, পরিচয়পত্র নেই, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা শেয়ার বাজার নেই। মানুষের এসব আছে বলেই তাকে সভ্য বলা হয়। কিন্তু শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক শক্তি যদি সংযম শেখানোর বদলে আরও নিখুঁতভাবে গ্রাস করার ক্ষমতা দেয়, তবে সেই সভ্যতা কেবল সুন্দর পোশাক পরা ক্ষুধা।
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা অবশ্য এখানেই। সে নিজের আচরণ নিয়ে ভাবতে পারে, ভুল চিনতে পারে এবং সীমা নির্ধারণ করতে পারে। জম্বি তার ক্ষুধার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে না, মানুষ তুলতে পারে। তাই আয়নায় নিজেকে দেখা কেবল ব্যঙ্গ নয়, পরিবর্তনের প্রথম শর্ত।
ভিডিও দেখুন
লেখক: অনাবিল সেনগুপ্ত। বিষয়: সামাজিক ব্যঙ্গ, ভোগবাদ, মানবতাবাদ, পরিবেশ ও যুক্তিবাদ।
