
দায়িত্বশীল পর্যটন মানে প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে ভ্রমণ করা। পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা সহজ; পাহাড়কে অক্ষত রেখে ফিরে আসা কঠিন। আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসার কথা বলি, অথচ সেই ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে রেখে আসি প্লাস্টিক, শব্দ, ধোঁয়া ও দখলের চিহ্ন। প্রশ্নটি তাই অস্বস্তিকর হলেও জরুরি—পর্যটক কি প্রকৃতির প্রেমিক, নাকি তার ওপর আধিপত্য চালানো এক ভোগী?
এখানে “ধর্ষক” শব্দটি আক্ষরিক অর্থে নয়; এটি জবরদখল, অসম্মতি এবং ধ্বংসাত্মক ভোগের একটি কঠোর রূপক। প্রকৃতিরও সহনক্ষমতা আছে। কোনো স্থান সুন্দর বলেই সেখানে আমাদের ইচ্ছামতো শব্দ করা, আবর্জনা ফেলা, গাছ ভাঙা কিংবা অবকাঠামোর নামে পাহাড় কেটে ফেলার অধিকার জন্মায় না।
দায়িত্বশীল পর্যটন: প্রেমের দাবি ও দখলের আচরণ
প্রেম যত্ন শেখায়; ভোগ শেখায় ব্যবহার করে ফেলে দিতে। কিন্তু অনেক পর্যটনকেন্দ্রে আমাদের আচরণ দ্বিতীয়টির কাছাকাছি। ঝরনার পাশে খাবারের প্যাকেট, সমুদ্রসৈকতে বোতল, বনে উচ্চস্বরে গান, বন্য প্রাণীর খুব কাছে গিয়ে ছবি—সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকে পর্যটকের আনন্দ। যে প্রকৃতির জন্য ভ্রমণ, সেই প্রকৃতিই তখন কেবল পটভূমি।
একজন প্রেমিক উপস্থিতির চিহ্ন হিসেবে ক্ষত রেখে যায় না। অথচ আমরা প্রায়ই মনে করি প্রবেশমূল্য দিয়েছি বলেই জায়গাটির বাতাস, নীরবতা, গাছপালা ও প্রাণীকুলের ওপর সাময়িক মালিকানা পেয়েছি। এই মালিকানাবোধই দায়িত্বহীন পর্যটনের মূল অসুখ।
সেলফির ফ্রেমের বাইরে যে ক্ষতি
ক্যামেরার ফ্রেমে থাকে সবুজ পাহাড়; ফ্রেমের বাইরে পড়ে থাকে চিপসের প্যাকেট। ছবিতে ধরা পড়ে শান্ত সমুদ্র; ভিডিওর বাইরে বাজে অসহনীয় শব্দ। সামাজিক মাধ্যমে আমরা প্রকৃতিপ্রেমী, কিন্তু বাস্তবে সেই প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতা ও নীরবতার দায় অন্য কারও ওপর ঠেলে দিই।
একটি প্লাস্টিকের বোতলকে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু হাজার পর্যটকের হাজারটি “তুচ্ছ” কাজই একটি জায়গার মাটি, পানি, প্রাণী ও দৃশ্যপট বদলে দেয়। পরিবেশ ধ্বংস সবসময় বুলডোজার দিয়ে শুরু হয় না; কখনও তা শুরু হয় “এটুকু ফেললে কী হবে?”—এই বাক্য দিয়ে।
প্রকৃতি কোনো স্টুডিও সেট নয়। ছবি তুলে চলে যাওয়ার পরও সেখানে নদী বইবে, প্রাণী বাঁচবে, স্থানীয় মানুষ জীবন কাটাবে।
পর্যটন শিল্পের অদৃশ্য মূল্য
পর্যটন স্থানীয় মানুষের আয় সৃষ্টি করতে পারে, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করাতে পারে এবং সংরক্ষণের অর্থ জোগাতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন পর্যটন বিপরীত ফলও আনে। পাহাড় কেটে রিসোর্ট, পানির উৎসের ওপর চাপ, অতিরিক্ত যানবাহন, বর্জ্য ব্যবস্থার অভাব এবং স্থানীয় মানুষের জমি ও জীবনযাত্রার ওপর দখল—এসবের মূল্য সাধারণত পর্যটক দেন না; দেয় প্রকৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী।
তাই শুধু “আরও পর্যটক” উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। কতজন পর্যটক একটি স্থানের সহনক্ষমতার মধ্যে প্রবেশ করছেন, বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে, স্থানীয় মানুষ সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন কি না—এই প্রশ্নগুলোই টেকসই পর্যটনের ভিত্তি।
সব পর্যটক কি একই?
অবশ্যই নয়। দায়িত্বশীল ভ্রমণকারী আছেন—যিনি নিজের বর্জ্য সঙ্গে ফেরান, নির্ধারিত পথ ব্যবহার করেন, প্রাণীকে বিরক্ত করেন না, স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করেন এবং ভোগের বদলে শেখাকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি প্রকৃতিকে “জয়” করতে যান না; তার কাছে অতিথি হতে যান।
পার্থক্যটি ভ্রমণের সংখ্যায় নয়, আচরণে। বহু জায়গায় যাওয়া কাউকে প্রকৃতিপ্রেমী বানায় না; বরং প্রতিটি জায়গাকে আগের মতো—বা সম্ভব হলে আরও ভালো অবস্থায়—রেখে আসার চেষ্টা তাকে দায়িত্বশীল করে।
দায়িত্বশীল পর্যটকের ন্যূনতম অঙ্গীকার
- নিজের সব বর্জ্য সঙ্গে ফিরিয়ে আনুন; “বায়োডিগ্রেডেবল” বলেও কিছু ফেলে যাবেন না।
- উচ্চ শব্দ, ড্রোন, উজ্জ্বল আলো ও বন্য প্রাণীর কাছে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করুন।
- গাছ, পাথর, প্রবাল বা কোনো প্রাকৃতিক বস্তু স্মারক হিসেবে তুলে আনবেন না।
- স্থানীয় গাইড, পরিবহন, খাবার ও আবাসন বেছে স্থানীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করুন।
- নির্ধারিত পথ ও ধারণক্ষমতার নিয়ম মানুন; নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশকে সাহসিকতা ভাববেন না।
- ছবি তোলার আগে মানুষ ও সংস্কৃতির সম্মতি নিন।
শেষ কথা
দায়িত্বশীল পর্যটন কোনো সাজসজ্জার শব্দ নয়; এটি প্রতিটি ভ্রমণের ন্যূনতম নৈতিক শর্ত।
পর্যটক প্রকৃতির প্রেমিকও হতে পারেন, ধ্বংসকারীও হতে পারেন। সিদ্ধান্তটি তার ভাষায় নয়, পদচিহ্নে লেখা থাকে। যে মানুষ পাহাড়ে গিয়ে নীরবতা শোনে, সমুদ্রের কাছে গিয়ে নিজের বর্জ্য ফেরত আনে এবং স্থানীয় জীবনের প্রতি সম্মান দেখায়—সে প্রকৃতির বন্ধু। আর যে সৌন্দর্য ভোগ করে ক্ষত রেখে আসে, কঠোর রূপকের ভাষায় সে প্রেমিক নয়।
প্রকৃতিকে ভালোবাসার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ছবি হলো—আপনি চলে যাওয়ার পর জায়গাটি যেন আপনার আগমনের কোনো ক্ষতিকর চিহ্ন বহন না করে।
লেখক: অনাবিল সেনগুপ্ত · বিষয়: পরিবেশ, দায়িত্বশীল পর্যটন ও সামাজিক সমালোচনা
