সম্পূর্ণ পরিমার্জিত ও তথ্যসমৃদ্ধ সংস্করণ
যাচাইকৃত তথ্যসূত্রসহ
মনস্তত্ত্ব · স্নায়ুবিজ্ঞান · যুক্তিবাদ · অনলাইন বই

ভূতাতঙ্ক: ভয় আজ পণ্য

কুসংস্কার, মস্তিষ্ক ও গণআতঙ্কের বিজ্ঞান। একটি বিশ্লেষণ

ভূমিকা: ভয়ের ব্যবসা

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আপনি বাড়িতে একা। ড্রয়িংরুমে বসে টেলিভিশন দেখছেন। টেলিভিশনের হালকা শব্দ ছাড়া বাড়িতে আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ একটা উচ্চশব্দ শুনতে পেলেন। শরীরে এসে লাগলো দমকা বাতাস। মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন, সদর দরজা খুলে ধাক্কা খাচ্ছে ফ্রেমের সাথে। মুহূর্তেই শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেল, হৃৎস্পন্দন এত বেড়ে গেল যে হৃদপিণ্ড বুকের খাঁচা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল, মেরুদণ্ড বেয়ে নামলো হিমেল স্রোত, মাংসপেশি শক্ত হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলেন। আসলে দমকা বাতাসেই দরজাটা খুলে গিয়েছিল। কেউ দরজা খুলে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেনি। তখন আপনি হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

ভয়! ভয়! আর ভয়! লেখাটা শুরু করতেই হবে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়ে:

"Fear is the main source of superstition, and one of the main sources of cruelty. To conquer fear is the beginning of wisdom." অর্থাৎ, "সব কুসংস্কারের জন্ম হচ্ছে ভয় থেকে। নিষ্ঠুরতারও প্রধান উৎস এই ভয়। ভয়কে জয় করা থেকেই মানুষ প্রজ্ঞাবান হতে শুরু করে।"

সূত্র: Bertrand Russell, "An Outline of Intellectual Rubbish" (1943), সংকলিত Unpopular Essays (George Allen & Unwin, 1950)।

মানবমনের সবচেয়ে মৌলিক প্রবৃত্তিগুলোর একটি হলো ভয়। কেবল মানুষ কেন, প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই সচেতনে বা অবচেতনে কাজ করে এই প্রবৃত্তি। কিন্তু ভয় থেকে শুধু কুসংস্কার বা নিষ্ঠুরতারই জন্ম হয় না। এই ভয় আজকের নাগরিক সমাজকেও নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। এই ভয়ের চালনাতেই ঠিক হয় চিকিৎসক থেকে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বাছাই, শিক্ষা অর্জন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, জমি থেকে ফ্ল্যাট কেনা, পুষ্টিকর থেকে ভেজালহীন খাদ্যের খোঁজ, দামি থেকে ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু ঘিরে রয়েছে ভয়! আর এই ভয়কে মূলধন করেই চলছে বহু মানুষের জীবিকা অর্জন। ভয়ই এখন ব্যবসা।

নৃতাত্ত্বিকদের পর্যবেক্ষণ বলে, ভয় থেকেই সৃষ্টি হয়েছে যাবতীয় দেবতা ও অপদেবতার ধারণা। এই বইয়ে আলোচনা মূলত সীমিত রাখা হবে কুসংস্কার তথা ভূতের ভয়ের মধ্যেই। কীভাবে এই একটিমাত্র ভয় আজও গণমাধ্যম, বুজরুকি ব্যবসা আর রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আর বিজ্ঞান কীভাবে তার আসল রহস্য উন্মোচন করে।

গায়ক নচিকেতার একটি গানের পঙক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক:

"ডাইনে বাঁয়ে, গঞ্জে গাঁয়ে, পুরোনো অথবা নতুন অধ্যায়ে, বিশৃঙ্খলা যতই বাড়ুক, গণতন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্র দু'চোখ বুজে রয়, ভ'হয়! ভ'হয়! ভ'হয়! ভয়! পাছে ভোট নষ্ট হয়।"

সূত্র: নচিকেতা চক্রবর্তী, গান 'ভয়'।

ভয় থেকে ভক্তি, আবার ভয় থেকেই ভূত। সেই ভূতের ভয় নিয়েই এগোবে এই বইয়ের আলোচনা। প্রথমে বিজ্ঞানের চোখে, তারপর বাস্তব ঘটনার আয়নায়।

ভয় কী? মস্তিষ্কের রাসায়নিক যুদ্ধ

ভয়কে অনুভব করা যতটা সহজ, ব্যাখ্যা করা ততটাই কঠিন। বিজ্ঞানীরা বলেন, ভয় হলো আমাদের মস্তিষ্কে জন্ম নেওয়া একটি 'চেইন রিঅ্যাকশন', যার সূচনা হয় বিশেষ কোনো উদ্দীপক থেকে, আর যা শেষ হয় এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণের মাধ্যমে, যার ফলে আমাদের শারীরিক কর্মপ্রক্রিয়ায় ঘটে লক্ষণীয় পরিবর্তন।

ভয় পাওয়ার জন্য একটি উদ্দীপক প্রয়োজন। একটি মাকড়সা, গলায় ধরা ছুরি, নির্জন ঘরে একা থাকা, ভরা অডিটোরিয়ামে স্টেজে বক্তৃতা দেওয়া, অন্ধকার রাস্তা, পরীক্ষার খাতা, চাকরির প্রথম দিন, কিংবা হঠাৎ দরজা খুলে গিয়ে ফ্রেমে ধাক্কা খাওয়া। অনেকের কাছে ভূতের সিনেমাও একটি শক্তিশালী উদ্দীপক।

ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ভয় মূলত একইভাবে কাজ করে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জোসেফ লিডক্সের গবেষণা দেখিয়েছে, প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের ভয়-বর্তনী (fear circuitry) মূলত একই রকম গঠন অনুসরণ করে বলেই ভয় পাওয়ার শারীরবৃত্তীয় অভিজ্ঞতা মানুষে মানুষে বিস্ময়করভাবে একরকম হয়। মানুষ যেভাবে ভয়ে সাড়া দেয়, স্তন্যপায়ী প্রাণীরাও একইভাবে সাড়া দেয়। যদিও ভয়ের উদ্দীপক আলাদা হতে পারে, প্রতিক্রিয়ার কাঠামো একই।

সূত্র: Joseph E. LeDoux, The Emotional Brain (Simon & Schuster, 1996); Joseph E. LeDoux, Anxious: Using the Brain to Understand and Treat Fear and Anxiety (Viking, 2015)।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভয় অনেকটাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কেউ হয়তো ভয় পান শুধু ভূতের সিনেমা দেখে, আবার কেউ ভয় পান সিনেমা দেখার পর নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে ফেরার সময়। এখানে মূল সীমাবদ্ধতা হলো। ভয় বা অন্য কোনো আবেগ পরিমাপ করার কোনো সর্বজনগ্রাহ্য মাপকাঠি নেই। রবার্ট উড জনসন মেডিকেল স্কুলের গবেষক মাইকেল লুইসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আশপাশের মানুষের আচরণ আমাদের ভয়ে সাড়া দেওয়াকে প্রভাবিত করে। আমরা ভয় পেতে শিখি ভীতিকর অভিজ্ঞতা থেকে, কিংবা চারপাশের মানুষ থেকে। ভয় সংক্রামক। একজনের ভয় সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। এই সংক্রামক চরিত্রই পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচিত 'মাস হিস্টিরিয়া' বা গণআতঙ্কের ভিত্তি তৈরি করে।

ভয়ের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক মানচিত্র

ভয় মূলত মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিক চেইন রিঅ্যাকশন। এর শুরু হয় কোনো চাপ-উদ্দীপক দিয়ে, শেষ হয় নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণে। এই রাসায়নিক পদার্থগুলোর কারণেই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়ে, মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়, হাতের তালু ঘেমে যায়, পাকস্থলী খালি মনে হয়। দেহের এই গোটা প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স' (fight-or-flight response)। শব্দবন্ধটি প্রথম ব্যবহার করেন শারীরবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ক্যানন তাঁর Bodily Changes in Pain, Hunger, Fear and Rage (1915) গ্রন্থে।

মস্তিষ্কের বিজ্ঞানসম্মত গবেষণায় পাঁচটি অঞ্চলকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো ভয়ের জন্ম-প্রক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা পালন করে:

১. থ্যালামাস। এই অঞ্চল ঠিক করে দেহের কোন অংশ (চোখ, কান, ত্বক) থেকে আসা তথ্য মস্তিষ্কের কোথায় পাঠাতে হবে।

২. সেন্সরি কর্টেক্স। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তার ব্যাখ্যা তৈরি করে।

৩. হিপ্পোক্যাম্পাস। সচেতন স্মৃতি জমা রাখে এবং প্রয়োজনে তা পুনরুদ্ধার করে; বিভিন্ন উদ্দীপক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভয়সহ নানা অনুভূতির প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

৪. অ্যামিগডালা। আবেগকে ডিকোড করে, সম্ভাব্য হুমকি নির্ণয় করে, ভয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ করে। টেম্পোরাল লোবের নিচে অবস্থিত এই অ্যামিগডালাই মস্তিষ্কের ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু। সবার আগে এটিই ভয়ে সাড়া দেয়।

৫. হাইপোথ্যালামাস। ফাইট-অর-ফ্লাইট প্রতিক্রিয়াকে সক্রিয় করে, অর্থাৎ ভয়ের সঙ্গে লড়াই করব নাকি পালাবো তা নির্ধারণ করে।

সূত্র: Joseph E. LeDoux, "Emotion Circuits in the Brain," Annual Review of Neuroscience, vol. 23 (2000), pp. 155–184।

আমাদের মাথার ভেতরে আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি স্নায়ুকোষ, যারা পরস্পরের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক বিশাল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। আমাদের সব কাজ, চিন্তা, দেখা, শোনা। সবকিছুরই সূচনা সেই মস্তিষ্কে। ভয়ের প্রক্রিয়া প্রায় পুরোটাই স্বয়ংক্রিয়। আমরা জেনেবুঝে এটি শুরু করি না, শুরু হওয়ার আগে বুঝতেও পারি না কীভাবে এটি ঘটবে, কতক্ষণ চলবে বা প্রতিক্রিয়া কী হবে।

ভয় পেলে নানা মানুষ নানাভাবে সাড়া দেয়। কেউ দৌড়ে পালায়, কেউ থ' মেরে বসে থাকে, কেউ চিৎকার জুড়ে দেয়। এটি বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া। এর পাশাপাশি শরীরের অভ্যন্তরেও পরিবর্তন ঘটে এপিনেফ্রিন, নরএপিনেফ্রিনসহ কিছু হরমোনের নিঃসরণের কারণে। হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়, চোখের মণি বড় হয়ে বেশি আলো গ্রহণের চেষ্টা করে, প্রধান পেশিতে বেশি রক্ত পাম্প হতে শুরু করে, রক্তের শর্করা বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনগুলো আসলে বিবর্তনের দিক থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এগুলো আমাদের শরীরকে বিপদ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

ভয় কীভাবে শেখা হয়, কীভাবে ছড়ায়

আমরা ভয় পাই, কারণ আমাদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ভয় অনেকটা ভাইরাসের মতো। সংক্রামক। যুক্তিবাদী মনের অধিকারী না হলে, সামান্য চেষ্টাতেই যে কারও মধ্যে যেকোনো স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে ভৌতিক কাহিনি শুনিয়ে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব। শিশুকালে খাওয়ানো, পড়ানো বা ঘুম পাড়ানোর জন্য যখন মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ভূত, জুজু, ব্রহ্মদত্যি, স্কন্ধকাটার নাম, অথবা কোনো পুকুর, বাড়ি বা পরিত্যক্ত জায়গা নিয়ে গালগল্প শোনানো হয়। তখন যে তাৎক্ষণিক ভীতি সঞ্চার হলো, সেটি মস্তিষ্কের স্মৃতিতে লুকিয়ে থাকে। সময়মতো তা আক্রমণ করে মনকে কাবু করে দিতে পারে।

আমরা বেশিরভাগ মানুষই অন্ধকার, পুরনো বাড়ি, কবরস্থান, বাঁশঝাড়কে ভয় পাই। কারণ, ছোটবেলা থেকেই নানাভাবে জেনে এসেছি এসব জায়গা ভূতের আস্তানা। হতে পারে গল্প, সাহিত্য, টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার মাধ্যমে। ভেবে দেখলে বোঝা যায়, কেউ যদি ছোটবেলা থেকে কখনো এমন গল্প বা ছবি না দেখে থাকে, তাহলে পরিত্যক্ত বাড়িতে রাতের অন্ধকারে গিয়েও তার মনে ভয়ের উদ্রেক হওয়ার কথা নয়। তাই বলা হয়, "মানুষ ভয় পেতে শেখে।"

সাঁতার না জেনে জলে পড়লে জল সম্পর্কে ভয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সেখানে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকে। কিন্তু ভৌতিক বিষয়ে ভীতিটা একটু আলাদা। এখানে গল্প বা ছবির মাধ্যমে জানলেই যথেষ্ট, নিজেকে সরাসরি ভূতের সামনে পড়তে হয় না। এভাবেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ভয় শেখা হয়ে আসছে বহু প্রজন্ম ধরে। আপনি ভয় পান, কারণ আপনাকে বিভিন্ন গল্প ও ছবির মাধ্যমে ভয় পেতে শেখানো হয়েছে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আপনাকে বাধ্য করেছে।

ফোবিয়া: যখন ভয় রোগ হয়ে ওঠে

ভয় মনের অবচেতন স্তরের একটি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা, যার একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। কিন্তু ভয় যখন সেই স্বাভাবিক মাত্রা অতিক্রম করে দীর্ঘস্থায়ী ও অস্বাভাবিক রূপ নেয়, তখন তাকে বলা হয় ফোবিয়া বা ভীতিরোগ। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়াল (DSM-5) 'নির্দিষ্ট ফোবিয়া' (Specific Phobia)-কে একটি স্বতন্ত্র মানসিক রোগের শ্রেণি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, এবং একে পাঁচটি বিস্তৃত ভাগে ভাগ করেছে। প্রাণী, প্রাকৃতিক পরিবেশ, রক্ত-ইনজেকশন-আঘাতজনিত, পরিস্থিতিগত এবং অন্যান্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর তথ্য অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নির্দিষ্ট ফোবিয়ার আজীবন প্রকোপ প্রায় ১২.৫%, আর নারীদের মধ্যে এই হার পুরুষদের প্রায় দ্বিগুণ।

সূত্র: National Institute of Mental Health, "Specific Phobia," nimh.nih.gov/health/statistics/specific-phobia; American Psychiatric Association, DSM-5, "Specific Phobia" শ্রেণি।

মনে রাখা দরকার, নিচের তালিকার নামগুলো মূলত জনপ্রিয় বা প্রচলিত (lay) পরিভাষা। এগুলো DSM-5-এর আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস নয়, বরং বিভিন্ন মনোরোগবিজ্ঞান-বিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রচলিত নামকরণ। তবু এগুলো ভয়ের বিচিত্র রূপ বোঝার জন্য সহায়ক:

১) এবলুটোফোবিয়া (Ablutophobia)। স্নান, ধোয়ামোছা বা পরিষ্কার করার ভয়।

২) অ্যাকুস্টিকোফোবিয়া (Acousticophobia)। শব্দভীতি।

৩) অ্যাক্রোফোবিয়া/অল্টোফোবিয়া (Acrophobia/Altophobia)। উচ্চতাভীতি।

৪) অ্যাগ্রাফোবিয়া (Agraphobia)। যৌন নিপীড়নের ভয়।

৫) অ্যাটিচিফোবিয়া (Atychiphobia)। ব্যর্থ হওয়ার ভয়।

৬) অটোফোবিয়া (Autophobia)। একাকিত্বের ভয়।

৭) এভিয়োফোবিয়া/এভিয়াটোফোবিয়া (Aviophobia/Aviatophobia)। ওড়ার ভয়।

৮) ব্যাসিলোফোবিয়া/ব্যাকটেরিওফোবিয়া (Bacillophobia/Bacteriophobia)। জীবাণু-ব্যাকটেরিয়ার ভয়।

৯) সিবোফোবিয়া/সিটোফোবিয়া (Cibophobia/Sitophobia)। খাদ্যের প্রতি ভয় বা বিরক্তি।

১০) ক্লস্ট্রোফোবিয়া (Claustrophobia)। বদ্ধ জায়গার ভয়, যেখানে আটকে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এমন বহু ভীতি বা ফোবিয়া দেখা যায় মানবসমাজে। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা 'ফোবিয়া' শব্দটি এড়িয়ে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। ব্যক্তিত্ব ডিসঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ইত্যাদি নামে।

ভূত, বিভ্রম আর মস্তিষ্কের প্রতারণা

"ভূত", "ভূতের ভয়" বা "ভর" মানুষের মনে আর সাহিত্য-গল্পের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এর অস্তিত্ব শূন্য। বর্তমানে কিছু গণমাধ্যম 'ভূত'কে পণ্য করে বা সস্তা বিনোদন হিসেবে বিক্রি করে মুনাফা লোটে। ভূত নিয়ে ব্যবসা করা কারবারিরা সবসময় চান, মানুষের মনে 'ভূতের ভয়' রয়ে যাক। সেই সুযোগে বাড়বাড়ন্ত হয় ওঝা, গুণিন, তান্ত্রিক, জ্ঞানগুরু গোছের বুজরুকদের।

সাধারণভাবে দেখা যায়, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, অশিক্ষিত বা বিজ্ঞান-যুক্তিবাদের আলো থেকে বঞ্চিত মানুষদের মধ্যেই ভূতে পাওয়া বা ভূতের ভর দেখার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। যুক্তি দিয়ে গ্রহণ করার চেয়ে বহুজনের বিশ্বাসকে অন্ধভাবে মেনে নিতে অভ্যস্ত মানুষদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কিছু কোষ একই চিন্তা বা কথা বারবার শোনার ফলে বারবার উত্তেজিত হতে থাকে। এর ফলে অনেক সময় সেই উত্তেজিত কোষগুলো অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ফলে অনেকে ভূত বা ঈশ্বর দেখেন, ঈশ্বরের বাণী শোনেন, ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলেন বলে দাবি করেন। মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থার লক্ষণ।

মনোবিজ্ঞান ও মনোরোগ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের ভ্রান্ত অনুভূতিকে বলা হয় ইলিউশন (Illusion), হ্যালুসিনেশন (Hallucination), ডেলিউশন (Delusion) এবং প্যারানয়া (Paranoia)।

Illusion (ভ্রান্ত অনুভূতি): মনোবিজ্ঞানে illusion হলো কোনো বস্তু প্রকৃতপক্ষে যা, তাকে সেভাবে উপলব্ধি না করা। পঞ্চেন্দ্রিয়ের ভিত্তিতে একে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। দর্শনানুভূতির ভ্রম (optical/visual illusion), শ্রবণানুভূতির ভ্রম (auditory illusion), স্পর্শানুভূতির ভ্রম (tactile illusion), ঘ্রাণানুভূতির ভ্রম (olfactory illusion) এবং স্বাদানুভূতির ভ্রম (taste illusion)।

Hallucination (অলীক বিশ্বাস): অস্তিত্বহীন কোনো কিছু সম্পর্কে অনুভূতি লাভ করাকে বলা হয় hallucination।

Delusion (মোহ, অন্ধ ভ্রান্ত ধারণা): Delusion-এ রোগীর মধ্যে বদ্ধমূল কিছু ভ্রান্ত ধারণা থাকে, যা যুক্তিহীন এবং অসুস্থ মস্তিষ্কেরই ফল। রুশ শারীরবিজ্ঞানী ইভান পাভলভের মতে, delusion-এর উৎপত্তির মূলে থাকে প্রথমত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের বিকারগ্রস্ত অনড়তা, দ্বিতীয়ত অতি-স্ববিরোধী মানসিক অবস্থা।

Paranoia (প্যারানইয়া): এই রোগী delusion রোগীর মতোই অন্ধ ভ্রান্ত বিশ্বাসের দ্বারা চালিত হন, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের পক্ষে এমন সংগঠিত যুক্তি হাজির করেন যে, বিশেষজ্ঞের পক্ষেও অনেক সময় বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানের চোখে, ভূতে পাওয়া বলে দাবি করা প্রতিটি মানুষই আসলে কোনো না কোনো মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত। তাদের ঘটানো অস্বাভাবিক কাণ্ডকারখানা আসলে সেই মানসিক রোগেরই বহিঃপ্রকাশ।

ভূতে পাওয়া আসলে কী? হিস্টিরিয়া থেকে সিজোফ্রেনিয়া

হিস্টিরিয়া, ফোবিয়া, সিজোফ্রেনিয়া, ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, অবসেশন, ম্যানিয়া-ডিপ্রেশন। এসব শারীরবৃত্তীয় ও মানসিক অসুস্থতাকেই তথাকথিত সমাজে ভূতের ভয় বা ভরের নামে চালানো হয়।

হিস্টিরিয়া

হিস্টিরিয়া একটি নিউরোসিস-জাতীয় মানসিক রোগ। মানসিক রোগ মূলত দুই প্রকার। মৃদু মাত্রার নিউরোসিস (অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, অবসেশন, হিস্টিরিয়া, ফোবিয়া) এবং জটিল মাত্রার সাইকোসিস (বিষণ্নতা, ম্যানিয়া, সিজোফ্রেনিয়া)। আমাদের অবচেতন মনের অবদমিত মানসিক দ্বন্দ্ব থেকেই হিস্টিরিয়া রোগের সৃষ্টি হয়। একে বলা হয় 'কনভার্সন ডিসঅর্ডার'। যেখানে শারীরিক লক্ষণ (হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে না পারা) দেখা দেয়, যদিও প্রকৃতপক্ষে কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি, এবং বয়ঃসন্ধিকালে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

একটি জরিপে পাওয়া ফলাফল অনুযায়ী, হিস্টিরিয়া আক্রান্তদের ৮৫% বয়স ১৩ বছরের নিচে, ৮৫.৭১% নারী, এবং ৮৫% নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত পরিবারের। কারণগুলোর মধ্যে সামাজিক অবস্থান (৩০%), পারিবারিক দ্বন্দ্ব (১৭%), যৌন সম্পর্কজনিত জটিলতা বা স্বামীর প্রবাসবাস (১৭%), শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূল আচরণ (১৪%) উল্লেখযোগ্য। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়। কম বয়স, দারিদ্র্য, স্বল্প শিক্ষা এবং লিঙ্গবৈষম্য এই রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। রোগীর আত্মীয়দের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস থাকে। ভূতের ভর, জিনে পাওয়া, বাতাস লাগা, নজর লাগা। এর ফলে পীর-ফকির, গুণিন, তান্ত্রিক, ওঝা বা মাজারে নিয়ে গিয়ে বুজরুকি চিকিৎসার শিকার হন প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী।

মাস হিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ

মাস হিস্টিরিয়া নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি একটি স্বীকৃত ও সুপরিচিত মানসিক ঘটনা। একজন আক্রান্ত হলে তা দ্রুত অন্যদের ওপর প্রভাব ফেলে। স্কুলে একসঙ্গে অনেক কিশোরী থাকায়, একজন আক্রান্ত হলে দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত মানসিক চাপ, মানসিক আঘাত এবং ডিহাইড্রেশনের কারণে এটি ঘটতে পারে। আক্রান্তরা শরীর জ্বালাপোড়া, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখান। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সাধারণত সামান্য পরিচর্যা, বিশ্রাম ও জলশূন্যতা দূর করলেই আক্রান্তরা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও এই ঘটনা সুপ্রতিষ্ঠিত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সাইমন ওয়েসলি এবং সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বার্থোলোমিউর দীর্ঘ গবেষণা 'ম্যাস সোশিওজেনিক ইলনেস' (mass sociogenic illness) নামের এই ঘটনাকে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় আবেশ থেকে শুরু করে রাসায়নিক-জৈবিক আতঙ্ক পর্যন্ত বহু প্রেক্ষাপটে নথিবদ্ধ করেছে। স্কুলভিত্তিক গণআতঙ্কের ইতিহাস নিয়ে তাঁদের পৃথক গ্রন্থও রয়েছে, যা ষোড়শ শতক থেকে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য অনুরূপ ঘটনার নথি তুলে ধরে।

সূত্র: Robert E. Bartholomew and Simon Wessely, "Protean Nature of Mass Sociogenic Illness," British Journal of Psychiatry, vol. 180 (2002), pp. 300–306; Robert E. Bartholomew and Bob Rickard, Mass Hysteria in Schools: A Worldwide History Since 1566 (McFarland, 2014)।

সিজোফ্রেনিয়া

মস্তিষ্ককোষের গতিময়তা একটি বিশেষ ধর্ম, যা সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। চিন্তাবিদ, গবেষক, সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানী শ্রেণির মানুষেরা সাধারণত কোনো একটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে পছন্দ করেন। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ফ্লেগমেটিক (Phlegmatic) মানসিক গঠন। এই ধরনের মানুষ কোনো জটিল প্রশ্ন বা রহস্যের সমাধান খুঁজে না পেলে, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতার কারণে সেই রহস্যের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, ধীরে ধীরে নিজেকে বাইরের জগৎ থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। মস্তিষ্কের একটি কোষের সঙ্গে অন্য কোষের সংযোগ বিঘ্নিত হতে থাকে, ফলে রোগী বাস্তববিমুখ হয়ে পড়েন এবং অলীক বিশ্বাসের শিকার হন। এই প্রক্রিয়াই সিজোফ্রেনিয়ার ভিত্তি তৈরি করে।

মাস হিস্টিরিয়া: গণআতঙ্কের বিজ্ঞান

তত্ত্বকথা যতটা স্পষ্ট, বাস্তব ঘটনাগুলো ঠিক ততটাই আশ্চর্যজনকভাবে একই প্যাটার্নে বারবার ফিরে আসে। ২০১৭ সালের আগস্টে দিল্লি, রাজস্থান, হরিয়ানা ও পাঞ্জাব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত আতঙ্ক। ঘুমের মধ্যেই নাকি কেউ মহিলাদের চুলের বেণী কেটে দিয়ে যাচ্ছে। আট থেকে আশি বছর বয়সী অসংখ্য নারী এই অভিযোগ তোলেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা তদন্তে শেষ পর্যন্ত কোনো ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা মেলেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি একধরনের গণমনস্তাত্ত্বিক ঘটনা ছিল, যেখানে উদ্বেগ ও গুজব একে অপরকে জ্বালানি জোগায়। দিল্লির গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এন এস ভাটিয়া একে ২০০১ সালের কুখ্যাত 'কালো বাঁদর' আতঙ্কের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেবারও গোটা শহর হঠাৎ রাস্তায় এক অদ্ভুত জীব দেখতে শুরু করেছিল, যা পরে সম্পূর্ণ উবে যায়।

এই আতঙ্কের একটি নির্মম পরিণতিও ঘটেছিল। আগ্রার কাছে বাগেলস মুটনাই গ্রামে ৬২ বছর বয়সী দলিত মহিলা মান দেবীকে 'বেণী-কর্তনকারী' সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভিত্তিহীন আতঙ্ক নিছক কুসংস্কার নয়। তা সরাসরি প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

সূত্র: "2017 Hair and Braid Chopping Incidents in India," Wikipedia; "Dalit Woman Suspected of Braid Cutting Lynched in Agra," The Tribune, আগস্ট ২০১৭; Scroll.in প্রতিবেদন, আগস্ট ২০১৭।

পশ্চিমবঙ্গেও একই প্যাটার্নের ঘটনা বারবার ঘটেছে। ২০২৪-২৫ সালে পুরুলিয়া জেলার একটি প্রাথমিক স্কুলে শৌচাগারে ভূত দেখার আতঙ্কে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। তাদের প্রতিনিধিরা স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন এবং কুসংস্কার নিরসনে সচেতনতামূলক আলোচনা করেন।

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন প্রতিবেদন, "পুরুলিয়ার স্কুলে ভূত-আতঙ্ক দূর করতে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ"; আজতক বাংলা প্রতিবেদন, ডিসেম্বর ২০২৫।

এই দুটি ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন স্থানের ঘটনা পাশাপাশি রাখলেই সত্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভূত-আতঙ্ক কোনো এক জায়গার বা এক সময়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি পুনরাবৃত্ত সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্ন, যা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন রূপে ফিরে আসে।

মাঠের অভিজ্ঞতা: যুক্তিবাদী সমিতির তদন্তে ভূতাতঙ্কের ঘটনা

তত্ত্ব ও পরিসংখ্যানের বাইরে, লেখকের নিজের সংগঠন। ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির বর্ধমান শাখার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বাস্তব ঘটনার কথা তুলে ধরা প্রয়োজন। এটি লেখকের নিজস্ব তদন্তের বিবরণ, সংগঠনের নথিভুক্ত রেকর্ড হিসেবে এখানে সংরক্ষিত।

ঘটনা: ২০১০ সালের নভেম্বরের প্রথম দিকে বর্ধমান জেলার বুদবুদ থানার সাহেবপুকুর এলাকার বাসিন্দা বৈদ্যনাথ ধীবর নিরুপায় হয়ে ভূতের উপদ্রব থেকে উদ্ধারের আবেদন জানান। ক্ষুদ্র মাছবিক্রেতা দুই ভাইয়ের আট সদস্যের অস্বচ্ছল পরিবারে অক্টোবরের শেষ থেকে বারবার আগুন লেগে জামাকাপড়, বইপত্র, মাছ ধরার জাল, টিভি সব পুড়ে যাচ্ছিল। থানা ও বিডিও অফিসে জানিয়েও সুরাহা হয়নি, প্রতিবেশীদের পরামর্শে ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়েও কাজ হয়নি।

যুক্তিবাদী সমিতির প্রতিনিধিরা দুই সাংবাদিকসহ সরেজমিনে হাজির হন। পোড়া জিনিসপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়, তা থেকে কেরোসিনের গন্ধ বেরোচ্ছে, জল ঢাললে বেগুনি রং ধরছে, এবং ঘরে পোড়া দেশলাইকাঠি পাওয়া যাচ্ছে একটি সদ্য-পোড়া প্লাস্টিকের পাখার পাশে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে কেরোসিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও পরে একটি কেরোসিনভর্তি স্টোভ পাওয়া যায় ঘরেই। কথাবার্তায় জানা যায়, পরিবারের অষ্টম শ্রেণিতে পড়া কিশোর বিট্টুই প্রতিবার প্রথম আগুন লাগা লক্ষ করত, এবং সে যেসব দিন বাড়ির বাইরে ছিল, সেসব দিন আগুন লাগেনি। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বিট্টুর মা-হারা খুড়তুতো দিদির লক্ষ্মীপুজোর দিনে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, কিন্তু ভুতুড়ে অগ্নিকাণ্ডের কারণে পরিবার ঘরছাড়া হওয়ায় বিয়েটি ভেস্তে যাচ্ছিল।

স্থানীয় ব্লক প্রশাসনের সহযোগিতায় বিট্টুর মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়, এবং পরিবারকে সাময়িকভাবে অন্যত্র রাখার পর বোঝা যায়, আগুন ভূতের নয়, মানুষেরই কাজ ছিল। কিছুদিন পরেই ব্লক প্রশাসন ও ধীবর পরিবার। দুই তরফ থেকেই সমিতি ধন্যবাদ পায়। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়। জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজন না মেটার হতাশা ও পারিবারিক সংকট থেকেই তৈরি হয় এমন 'ভুতুড়ে' নাটক, যার আসল সমাধান নিছক মানসিক চিকিৎসায় নয়, বরং সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

সূত্র: লেখকের ব্যক্তিগত তদন্তের বিবরণ, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি, বর্ধমান শাখা, নভেম্বর ২০১০। সংগঠনের নথিভুক্ত রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষিত।

এই একটিমাত্র ঘটনাই বারবার প্রমাণ করে দেয়, ভূতের আতঙ্কের পেছনে প্রায় সবসময়ই লুকিয়ে থাকে মানসিক সংকট, সামাজিক চাপ বা কারও ব্যক্তিগত সংকট। যাকে যুক্তি আর সহানুভূতি দিয়ে খুঁজে বের করা সম্ভব, ওঝা-তান্ত্রিকের বুজরুকি দিয়ে নয়।

ভয়কে জয় করার বিজ্ঞানসম্মত উপায়

ভয় যে আমাদের বিপদের বন্ধু, তাতে সন্দেহ নেই। ভয়ই বলে দেয় বিপদ থেকে বাঁচতে হবে, নিজেকে রক্ষা করতে হবে। মানুষের ইতিহাসে বারবার ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে, তা থেকে সরে গিয়ে বা প্রতিরোধ করেই মানুষ টিকে থেকেছে। ভয় পাওয়ার এই প্রক্রিয়া মানুষের বিবর্তনীয় প্রয়োজনেই তৈরি। তাই ভয় পাওয়া দোষের কিছু নয়, কিন্তু ভীতু হয়ে থাকা সমস্যার।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর "নৈবেদ্য" কাব্যগ্রন্থের "প্রার্থনা" কবিতায় (১৯০১) লিখেছিলেন:

"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি..."

এই কবিতাটিই রবীন্দ্রনাথের নিজের ইংরেজি অনুবাদে পরবর্তীকালে ১৯১২ সালে প্রকাশিত ইংরেজি "গীতাঞ্জলি"-র ৩৫ সংখ্যক কবিতা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায় ("Where the Mind Is Without Fear")। বাংলা মূল কবিতাটি নৈবেদ্য থেকেই, ইংরেজি অনূদিত রূপটি গীতাঞ্জলি থেকে। দুটি তথ্যই সঠিক, একে অপরের পরিপূরক।

সূত্র: বাংলা উইকিপিডিয়া, "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য"; Rabindranath Tagore, Gitanjali (The India Society, London, 1912), Poem 35।

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি বহুশ্রুত কবিতাও এই প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য:

"বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়। বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে। বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো। অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায় অনায়াসে সম্মতি দিও না। কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়, তারা আর কিছুই করে না, তারা আত্মবিনাশের পথ পরিষ্কার করে।"

(এই কবিতাটি বিভিন্ন সংকলনে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নামে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হলেও, এর মূল কাব্যগ্রন্থের নাম স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই নির্দিষ্ট গ্রন্থের নাম উল্লেখ না করে এখানে শুধু কবির নামসহ উদ্ধৃত করা হলো।)

মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী ভয় জয় করার কিছু বাস্তবসম্মত উপায়:

১। 'কেন' ভয় পাচ্ছেন তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবার দরকার নেই। সময় নষ্ট না করে পরবর্তী পদক্ষেপে মন দিন।

২। যা নিয়ে ভয় পাচ্ছেন, সে সম্পর্কে যতটা সম্ভব জানার চেষ্টা করুন। অনিশ্চয়তা ও তথ্যের অভাব ভয়ের জন্ম ও বিকাশে সহায়তা করে।

৩। কঠিন মনে হওয়া বিষয়টি জয় করার চেষ্টা শুরু করুন। প্রশিক্ষণ নিন, সময় দিন। ধীরে ধীরে ভয় ভাঙবে।

৪। যিনি সেই বিষয়ে ভয় পান না, এমন কারও সঙ্গ নিন। তাঁর সঙ্গে সময় কাটালে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

৫। ভয়ের বিষয়টি নিয়ে অন্যদের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন। আলোচনা করলে ভয় কম ভয়ংকর মনে হয়।

৬। "মনের বাঘ" থেকে মুক্তি পেতে নিজের সঙ্গে ইতিবাচক 'মাইন্ড গেম' খেলুন।

৭। অনেক দূরের পরিণতি নিয়ে না ভেবে, ঠিক পরের পদক্ষেপটি নিয়ে ভাবুন।

৮। প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিন। চিকিৎসক, পরামর্শদাতা বা মনোবিদের সহায়তা ভয় জয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

৯। নিয়মিত বৈজ্ঞানিক মেডিটেশন ও শরীরচর্চা করুন। দলবদ্ধ কোনো ভালো কাজে যুক্ত থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং মনের ভীতি কমে। একে বলা হয় 'গ্রুপ থেরাপি'।

১০। নিয়মিত জীবনযাপনে যুক্তিবাদী চিন্তাচর্চা বজায় রাখলে ভয়কে সহজেই জয় করা সম্ভব।

১১। শৈশব থেকে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অলীক ভীতিমূলক গালগল্প বা গুজব থেকে নিজের পরিবার ও সমাজকে দূরে রাখুন।

উপসংহার: যুক্তিই মুক্তি

এই বইয়ে আমরা দেখলাম, ভয় নিছক একটি অনুভূতি নয়। এটি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘটা এক জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যা বিবর্তনের দীর্ঘ পথে মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু এই একই ভয়কে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে কুসংস্কারের বিশাল কারবার। ওঝা-তান্ত্রিক থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেলের 'ভূতুড়ে' অনুষ্ঠান পর্যন্ত।

ভূতে পাওয়া, ভর হওয়া বা ভৌতিক আতঙ্কের প্রতিটি ঘটনার পেছনে বিজ্ঞান খুঁজে পেয়েছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। হিস্টিরিয়া, মাস হিস্টিরিয়া, সিজোফ্রেনিয়া, ফোবিয়া বা সাধারণ সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট। বর্ধমানের বুদবুদ থেকে পুরুলিয়া, দিল্লি থেকে বাঁকুড়া। একই প্যাটার্ন বারবার ফিরে এসেছে, আর প্রতিবারই তার সমাধান এসেছে যুক্তি, সহানুভূতি ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের হাত ধরে, ওঝার মন্ত্র দিয়ে নয়।

তাই শেষ কথা একটাই। ভয়কে অস্বীকার নয়, ভয়কে বোঝা প্রয়োজন। ভয়ের বিজ্ঞান বুঝলেই কুসংস্কারের অন্ধকার কেটে যায়, আর যুক্তিবাদী মন হয়ে ওঠে প্রকৃত মুক্তির পথ।

গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র

১. Bertrand Russell, "An Outline of Intellectual Rubbish" (1943), সংকলিত Unpopular Essays (George Allen & Unwin, 1950)।

২. Joseph E. LeDoux, The Emotional Brain: The Mysterious Underpinnings of Emotional Life (Simon & Schuster, 1996)।

৩. Joseph E. LeDoux, Anxious: Using the Brain to Understand and Treat Fear and Anxiety (Viking, 2015)।

৪. Joseph E. LeDoux, "Emotion Circuits in the Brain," Annual Review of Neuroscience, vol. 23 (2000), pp. 155–184।

৫. Walter B. Cannon, Bodily Changes in Pain, Hunger, Fear and Rage (D. Appleton & Company, 1915)।

৬. American Psychiatric Association, Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, 5th ed. (DSM-5), "Specific Phobia" শ্রেণি।

৭. National Institute of Mental Health, "Specific Phobia," nimh.nih.gov/health/statistics/specific-phobia।

৮. Robert E. Bartholomew and Simon Wessely, "Protean Nature of Mass Sociogenic Illness: From Possessed Nuns to Chemical and Biological Terrorism Fears," British Journal of Psychiatry, vol. 180 (2002), pp. 300–306।

৯. Robert E. Bartholomew, Simon Wessely, and Gideon J. Rubin, "Mass Psychogenic Illness and the Social Network: Is It Changing the Pattern of Outbreaks?," Journal of the Royal Society of Medicine, vol. 105, no. 12 (2012)।

১০. Robert E. Bartholomew and Bob Rickard, Mass Hysteria in Schools: A Worldwide History Since 1566 (McFarland, 2014)।

১১. "2017 Hair and Braid Chopping Incidents in India," Wikipedia।

১২. "Dalit Woman Suspected of Braid Cutting Lynched in Agra," The Tribune, আগস্ট ২০১৭; Scroll.in প্রতিবেদন, আগস্ট ২০১৭।

১৩. সংবাদ প্রতিদিন প্রতিবেদন, পুরুলিয়ার স্কুলে ভূত-আতঙ্ক ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত; আজতক বাংলা প্রতিবেদন, ডিসেম্বর ২০২৫।

১৪. Rabindranath Tagore, Naibedya (1901), কবিতা "প্রার্থনা"; Gitanjali (The India Society, London, 1912), Poem 35।

১৫. লেখকের ব্যক্তিগত তদন্তের বিবরণ, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি, বর্ধমান শাখা, নভেম্বর ২০১০।

লেখক পরিচিতি

অনাবিল সেনগুপ্ত। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, লেখক এবং বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদভিত্তিক যোগাযোগকর্মী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে কুসংস্কার-বিরোধী মাঠপর্যায়ের কাজ করে আসছেন, এবং তাঁর লেখালিখির মূল সুর বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ ও সামাজিক সচেতনতা। "Exposed Emotions" (AAOS) নামে তাঁর সাংস্কৃতিক-বৌদ্ধিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান, সমাজ ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে নিয়মিত লেখেন।

যোগাযোগ ও আরও লেখার জন্য: anabilsengupta.com

© Anabil Sengupta · Exposed Emotions · AAOS। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।